বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০

মোদিকে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৫ ১২:৫০:৫০ || আপডেট: ২০২০-০৩-০৫ ১২:৫০:৫০

আনিস আলমগীর::
গত সপ্তাহে দিল্লি সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষায়’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘প্রচুর পরিশ্রমের’ প্রশংসা করছেন, তখন দিল্লিতে চলছিল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এর আগে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ‘কসাই’ খেতাবপ্রাপ্ত নরেন্দ্র মোদিকে এবারও আন্তর্জাতিক মিডিয়া দিল্লি দাঙ্গার জন্য অভিযুক্ত করেছে। ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘নব্য হিটলার’ নানা নামে প্রতিদিন তাকে অভিষিক্ত করে লেখা হচ্ছে নানা সংবাদ ও পর্যালোচনা। দেশে-বিদেশে মোদিকে যখন মুসলমান নির্যাতনের অভিযোগে ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে, এমনই এক পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করতে যাচ্ছেন আগামী ১৭ মার্চ ২০২০।
ক’দিন আগে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘মোদিকে দেওয়া নিমন্ত্রণ অনেক আগের।’ মানে দিল্লির দাঙ্গার পরে মোদির ইমেজের যে অবস্থা, তাতে আওয়ামী লীগও বিব্রত তার আগমন নিয়ে। কিন্তু হজম করতে হচ্ছে। অবশ্য ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা মোদির আমন্ত্রণ বাতিল করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় যে শোর উঠেছে; বাম ও ইসলামি দলগুলো থেকে যে দাবি উঠেছে; তাকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘নিমন্ত্রণ বাতিলের প্রশ্নই আসে না।’ মোদির বাংলাদেশে আগমনের ব্যাখ্যা দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা মাথায় রেখেই মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদিকে দাওয়াত করা হয়েছে।’

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের চলমান সুসম্পর্ক—যেটারই কথা বলা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির এবারের বাংলাদেশ সফর যে চরম বিতর্কের সূত্রপাত করেছে, তাতে কারও দ্বিমত নেই। ভারতের পররাষ্ট্র দফতর যদিও এতে ‘পাকিস্তানের হাত’ খুঁজে পেয়ে সংবাদ জোগাচ্ছে, তাদের দেশীয় মিডিয়ায়, বাস্তবতা হচ্ছে নাগরিকত্ব আইন, নাগরিকপঞ্জি এবং মুসলমান নির্যাতন দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থার বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া এখন ভারতের সঙ্গে তার কোনও প্রতিবেশীর সুসম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর, কিংবা ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার এবং বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা যখন তৎপরতা চালিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে, তাদের চেষ্টাতে জল ঢেলে দিচ্ছে মুসলমানদের নিয়ে মোদি সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি।

সম্পর্কের খাতিরে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, ওবায়দুল কাদের বা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতে মুসলিম নিপীড়নকে যতই ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ’ বিষয় বলে সার্টিফিকেট দিক, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে করে না। অভ্যন্তরীণ বিষয়ের কথা বলে কোনও রাষ্ট্র তার সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন, নিশ্চিহ্ন এবং রাষ্ট্রহীন করার পরিকল্পনা নিতে পারে না। প্রতিবেশী মুসলমানদের কিছু হলে এই বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া হবেই, যেমন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা সংকট, নিপীড়নের শিকার হলে ভারতে তার প্রতিক্রিয়া হয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে তখন তাতে প্রকাশ্যে নাক গলায়। সুতরাং নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে এখানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়াটা স্বাভাবিক এবং আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত দল বলে এই প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা করতে হয়। এতে ‘পাকিস্তানের হাত খুঁজে পাওয়া’ এবং নিজস্ব মিডিয়ায় তা জোগান দেওয়া ভারতের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা।

এবার আসি চরম বাস্তবতায়। সবার জানা আছে, ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। আবার ২০২১ সালে বাংলাদেশের জন্মের ৫০তম বার্ষিকী। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উভয় অনুষ্ঠান দেশব্যাপী জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করবে এবং বিদেশের বিভিন্ন সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধান, সম্মানিত ব্যক্তিদের ওই অনুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর ভারতের তরফ থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ উদ্যোগে এই দুই অনুষ্ঠান পালনের প্রস্তাবও করা হয়েছিল। সম্ভবত বাংলাদেশ সরকারের অনাগ্রহের কারণে যৌথ উদ্যোগে খুব বেশি অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনায় বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণসহ জন্মশতবর্ষের কিছু আয়োজনে ভারতকে অংশীদার করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদিকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তার সফরের খুঁটিনাটি ঠিক করতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এখন ঢাকা সফর করছেন।

কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকেও আমন্ত্রণ জানানোর কথা শুনেছিলাম। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জিকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারেন। ভারত ও বাংলাদেশের নেতাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তার মধ্যে উভয় রাষ্ট্রে শুধু প্রণব মুখার্জি জীবিত আছেন। উভয় রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ নেতাই প্রয়াত।

আবার ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জার্মানি থেকে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে দিল্লিতে নিরাপদে রাখার যে উদ্যোগ প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রণব মুখার্জি জড়িত ছিলেন। তখন তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পারিবারিক সম্পর্কের মতো মধুর সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে সমবেদনা জানাতে তার প্রয়াত স্ত্রীর শ্মশানঘাটের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একদিনের সফরে ভারত গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারী এবং ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকও মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে যোগদান করবেন।

ভারতে এখন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস-এর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বিজেপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর স্বপ্নে বিভোর বিজেপির এখন মুখ্য কাজ হচ্ছে ভারতের ২০ কোটি মুসলমানকে নিশ্চিহ্ন করা এবং সেই প্রয়োজনকে লক্ষ্য রেখে মোদি সরকার নাগরিকত্ব আইন, নাগরিকপঞ্জি, লোকগণনা ইত্যাদি নিয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে ২০ কোটি মুসলমান ভারতে বসবাস করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই মুসলমানেরা এখন এসব আইন রহিতকরণ দাবি করে সংগ্রাম করছে। তাদের সমর্থনে রয়েছে প্রধান প্রধান বিরোধী দলও।

অনেক রাজ্য বিধানসভা তাদের রাজ্যে এসব আইন কার্যকর না করার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, পাঞ্জাব, রাজস্থান তার মধ্যে রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক আর আসাম ছাড়া বিজেপির হাতে বড় কোনও রাজ্য নেই। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্র ও তেলেঙ্গানায় স্থানীয় দলগুলো ক্ষমতায়। তারাও মনে হয় না নরেন্দ্র মোদির এই তিন আইন বাস্তবায়ন করবে। সেখানেও এই আইনগুলোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে।

গত দুই মাস ধরে দিল্লির শাহীনবাগে মুসলিম মহিলারা এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান ধর্মঘট করে যাচ্ছিল। সম্প্রতি ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় এই সমাবেশ উৎখাত করার চেষ্টা করেছে বিজেপি। কিন্তু সমাবেশকারীরা এক ইঞ্চিও না সরার কথা বলেছে এবং এই নিয়ে দিল্লিতে নির্মম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। শত শত লোক আহত হয়েছে এবং এই পর্যন্ত ৪৭ জন লোক প্রাণ হারিয়েছে।

আগেই বলেছি, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কয়েকটি বাম এবং ইসলামি দলের পক্ষ থেকে নরেন্দ্র মোদির নিমন্ত্রণ বাতিল করার দাবি উঠেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে মাওলানা আহমদ শফীর হেফাজতে ইসলামকে। কারণ তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে ২৮ হাজার কওমি মাদ্রাসা। মোদির রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ বাতিলের দাবি জানিয়ে শফী বলেছেন, ‘মুজিববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায় না। মোদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে গুজরাট, কাশ্মির ও দিল্লিসহ অনেক রাজ্যের মুসলমানদের খুন করা হয়েছে। চরম নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে। তাই যার হাতে এখনও মুসলিম গণহত্যার দাগ লেগে আছে, তার উপস্থিতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।’

বাম, ইসলামি দল এবং আরও যারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর বাতিলের দাবি তুলছে তাদের বোঝা উচিত—ভারত বড় দেশ, আমাদের সুখে-দুখের সঙ্গী, মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া নিমন্ত্রণ বাতিল করা যাবে না। কারণ বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদিকে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। ভারত কেন, এমনকি ছোট রাষ্ট্র ভুটানের রাজাকেও নিমন্ত্রণ জানিয়ে তা বাতিল করা সম্ভব নয়। এটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিরুদ্ধ কাজ। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দাবি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার বিপক্ষে। তাছাড়া, এই দাবি ইতোমধ্যে নরেন্দ্র মোদির জন্য বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। নিমন্ত্রণকারী দেশের মানুষ দাবি তুলেছে তার নিমন্ত্রণ বাতিল করার জন্য—এটাই তো সবচেয়ে অবমাননাকর বিষয়। সুতরাং আর বেশি অগ্রসর হওয়া সমীচীন হবে না।-বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

SunMonTueWedThuFriSat
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
   1234
19202122232425
262728293031 
       
293031    
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031